রোববার   ২৯ জানুয়ারি ২০২৩   মাঘ ১৬ ১৪২৯   ০৭ রজব ১৪৪৪

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
সর্বশেষ:
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফাইনাল রাউন্ডে ব্রাজিল
২৬

জেনে নিন, হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেলিওরের মধ্যে পার্থক্য

প্রকাশিত: ৫ ডিসেম্বর ২০২২  

মানুষের জটিল রোগগুলোর মধ্যে একটি হার্ট অ্যাটাক। কারো কারো হার্ট ফেইলিয়রও হয়। এই দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন মুন্নু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ্। 

হার্ট অ্যাটাক এমন একটি অসুস্থতা যার জটিলতার জন্য প্রতি চারজনে একজন তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন এবং আরও অনেকে হাসপাতালে ভর্তির পরও মৃত্যুবরণ করেন।

আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক সংখ্যক ব্যক্তি এক বছরের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে এ রোগকে বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হার্ট অ্যাটাকের ফলে হার্টের একটি নির্দিষ্ট অংশ অকেজো হয়ে যায়।

ফলে হার্ট তার কার্যক্ষমতা আংশিকভাবে হারিয়ে দুর্বল হয়ে যায়। দুর্বল হার্ট প্রায় সময়ই ব্যক্তির শারীরিক প্রয়োজনমাফিক রক্ত পাম্প করতে ব্যর্থ হয়, যার জন্য পরবর্তী সময়ে শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিতে থাকে এবং উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ না করলে দ্রুত হার্টের দুর্বলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

প্রাথমিক অবস্থায় হার্ট তার গতি বৃদ্ধি করে প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহ করার প্রয়াস পায়, তবে এ ধরনের আচরণের ফলে হার্টের মাংসপেশির ক্ষতির পরিমাণ দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং হার্ট এক সময় মারাত্মক অবস্থায় পতিত হয়; যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার আর কোনো পথ খোলা থাকে না। রোগীর শরীরে ধীরে ধীরে হার্ট ফেইলুরের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে।

যেমন- অল্প পরিশ্রমে বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট অনুভব করা, খুব সহজে হাঁপিয়ে ওঠা, চিৎ হয়ে শুতে গেলে নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার মতো উপক্রম হওয়া, পেট ফেঁপে যাওয়া, সবসময় পেট ভরা ভরা অনুভূতি হওয়া, ক্ষুধামন্দা দেখা দেওয়া, বুক ধড়ফড় করা, বুকে চাপ অনুভব করা, কাজকর্মে মনোযোগ নষ্ট হওয়া, কাজ কর্মে অনীহা দেখা দেয়া, অত্যধিক শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেওয়া, হাতে-পায়ে পানি আসা ও ফুলে যাওয়া, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাবের উদ্বেগ হওয়া, অস্থিরতা দেখা দেয়া, ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট অনুভব করা।

ফলে ঘুম ভেঙে যাওয়া, খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ খুব কমে যাওয়া, প্রায়ই পেট খারাপ হওয়া, ঘন ঘন সর্দি-কাশি বা জ্বরে আক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দেয়। হার্ট অ্যাটাকের পরে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে হার্টকে দুর্বলতার হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ জরুরি। অনিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ, চিকিৎসা গ্রহণ না করারই শামিল।

অনেককে দেখা যায়, কিছুদিন চিকিৎসা গ্রহণের পর তারা সুস্থ হয়ে গেছেন এ ধরনের ধারণা থেকে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন। এর ফলে ধীরে ধীরে রোগীর হার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে এবং ক্ষতির মাত্রা চরমে পৌঁছার পর আবার শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে থাকে; তখন রোগীর হার্ট এত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় যে, তাকে আর চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলার তেমন কোনো সুযোগ থাকে না।

হার্ট অ্যাটাক-পরবর্তী সময়ে অনেকেই হার্টে রিং পরে থাকতে পারেন। যদি আপনি রিং পরেন অথবা বাইপাস অপারেশন করেন অথবা কোনোটিই না করে থাকেন, সবক্ষেত্রের উপযুক্ত মেডিসিন চিকিৎসা (Non invasive কাটাছেঁড়াবিহীন চিকিৎসা) গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।

তা না হলে হার্ট খুব দ্রুত দুর্বল হয়ে যাবে এবং পরবর্তী সময়ে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। যারা একবার হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের সুস্থ থাকার জন্য সারা জীবন কম-বেশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়।

হার্ট ফেলিওর

* হার্ট ফেলিওর হচ্ছে রক্ত পাম্প করতে ব্যর্থ হওয়া।

* হৃদপেশি দুর্বল বা সঠিকভাবে কাজ করতে না পারা হার্ট ফেলিওরের প্রধান উপসর্গ হিসেবে সাধারণত দেখা দেয়; শ্বাসকষ্ট, খুব ক্লান্ত বোধ এবং গোড়ালি ফুলে যাওয়া; এসব উপসর্গ অন্যান্য রোগেও থাকতে পারে।

* একিউট হার্ট ফেলিওর হলে হাসপাতালে দ্রুত চিকিৎসা করা প্রয়োজন হবে। উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে ক্রনিক হার্ট ফেলিওর পরিণত হতে পারে।

হার্ট ফেলিওর প্রধানত ৩ (তিন) ধরনের হয়। যেমন-

* লেফট হার্ট ফেলিওর- (HFREF-heart failure due to reduced ejection fraction) বাম নিলয়ে রক্ত পাম্প দুর্বল হওয়ার কারণে সৃষ্ট হার্ট ফেলিওর।

* ডায়াস্টলিক হার্ট ফেলিওর (HEPEF-heart failure with preserved ejection (reaction) সাধারণত বাম নিলয়ে রক্ত দিয়ে ভর্তি হতে অসুবিধা, যার ফলে হার্ট শক্ত হয়ে যায়।

* কনজেসটিভ হার্টফেলিওর (CCF-Congestive Cardiac failure) -ক্রমিক হার্ট ফেলিওর

হার্ট ফেলিওরের কারণ

হার্ট ফেলিওরের নির্দিষ্ট একক কোনো কারণ নেই।

* উচ্চরক্তচাপ (High Blood Pressure)- অতিরিক্ত রক্ত চাপের কারণে হার্ট ফেলিওর হতে পারে।

* করোনারি হার্ট ডিজিজ- ফ্যাটি পদার্থ দ্বারা সরবরাহকারী ধমনিতে অথেরোস্কে¬রোসিস হয়।

* হৃদপেশি দুর্বলতা (Cardiomyopathy) ক্রনিক হার্ট ফেলিওর হয়। এর কারণ প্রায়ই অস্পষ্ট তবে সাধারণত ভাইরাল, জেনেটিক, এলকোহল গ্রহণ, ওষুধ অথবা ক্যান্সারের কারণে হতে পরে।

* হৃদ রিদিমে জটিলতা (atrial fibrillation)

* হার্ট বাল্ব রোগ, ক্ষতি বা সমস্যা।

কখনও কখনও রক্তস্বল্পতা, অতিসক্রিয় থাইরয়েড গ্রন্থি (হাইপারথাইয়েডিজম) বা ফুসফুসের উচ্চরক্তচাপ (পালমোনারি হাইপারটেনশন)-এ হার্ট ফেলিওর হতে পারে।

হার্ট ফেলিওরের চিকিৎসা

* অধিকাংশ ক্ষেত্রে হার্ট ফেলিওর নিরাময় করা যায় না। নিয়ন্ত্রণই হচ্ছে এর চিকিৎসা। সুতরাং জীবন ধারা পরিবর্তন, ওষুধ ডিভাইস বা হার্ট ফাংশন উন্নতকরণ, সার্জারিসহ একটি সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থাই দিতে পারে রোগীকে সুস্থ জীবন।

* যখন হার্ট ফেলিওরের নির্দিষ্ট কারণ থাকে, সেখানে এটি নিরাময় করা সম্ভব হতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, হার্টের বাল্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলে, বাল্বের চিকিৎসার মাধ্যমে হার্ট ফেলিওর চিকিৎসা সাধারণত জীবনব্যাপী ভালো হয়। খারাপ লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আপনার ডাক্তার দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং কার্যকরী চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করবেন।

হার্ট ফেলিওর সমন্বিত কার্যকর চিকিৎসা নিলে নিুলিখিত সুবিধা রোগী পেয়ে থাকেন।

* হৃদপেশি শক্তিশালী করতে সাহায্য করে

* উপসর্গ হ্রাস করে

* বিস্তারণ (ক্রনিক) ঝুঁকি হ্রাস করে

* চিকিৎসা শর্তাবলী মেনে চললে রোগীর জীবনযাপন উন্নত হয় এবং পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপন করতে পারবেন

হার্ট ফেলিওর প্রতিরোধ

হার্ট ফেলিওর প্রতিরোধ, অনেকাংশে জীবনধারা পরিবর্তন করে, একটু সচেতন হয়ে বা ওষুধ গ্রহণ করে সম্ভব হতে পারে।

উদাহরণ স্বরূপ জীবনধারা পরিচালনায় যে বিষয়গুলো আপনাকে মেনে চলতে হবে।

* ধূমপান বন্ধ (যদি আপনি ধূমপান করে থাকেন)

* একটি সুস্থ পর্যায়ে আপনার রক্তচাপ রাখা

* কোলেস্টরলের মাত্রা আপনার নিয়ন্ত্রণে রাখা

* একটি স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা

* বাড়তি লবণ এড়ানো

* নিয়মিত ব্যায়াম করা

* পরিমিত এলকোহল গ্রহণ

হার্ট ফেলিওয়ের সঙ্গে বসবাস

হার্ট ফেলিওর একটি অভিঘাত হিসেবে আসতে পারে। ফুসফুসের সমস্যা, কিডনি রোগ, রক্তাল্পতা এবং ডায়াবেটিস এটি আপনার চিকিৎসা ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

আপনাকে স্ব-যত্ন এবং আপনার যত্নে যারা জড়িত তাদের আপনার স্বাস্থ্য এবং Wellbeing জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।

আপনি গ্রহণ করছেন এমন ওষুধ বা কোনো সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকে তাহলে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং উপসর্গ ও উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা করবেন। হার্ট ফেলিওর সম্পর্কে আপনি জানেন এবং হার্ট ফেলিওরের সঙ্গে নিরাপদ বসবাস করবেন।

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
 কুষ্টিয়ার  বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর