বুধবার   ১০ আগস্ট ২০২২   শ্রাবণ ২৬ ১৪২৯   ১২ মুহররম ১৪৪৪

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
৩৪৬৯

‘তীরের ক্ষত শুকিয়ে যায় তবে মুখের কথার আঘাত শুকায় না’

প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি ২০১৯  

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদি.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে রেওয়াত করেন যে, কোনো মুমিন তিরস্কারকারী, লানতকারী, গালিগালাজকারী, খারাপ-মন্দ উচ্চারণকারী হতে পারে না।

 

অর্থাৎ মুমিনের পক্ষে কখনো অন্য মানুষকে তিরস্কার, অভিসাপ, গালমন্দ প্রকাশ পেতে পারে না। এই হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি জিনিস বর্ণনা করেছেন। যা জিহ্বা বা জবানের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

তিরস্কার কী?

এ হাদিসে প্রথম যে কথা বলা হয়েছে, তা হলো, মুমিন তিরস্কারকারী হতে পারে না। তিরস্কার হলো, কোনো ব্যক্তিকে জড়িয়ে এমন কথা বলা, যার কারণে সে মনে কষ্ট পায়। দেখুন, একটি হলো, একব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে সরাসরি বললো, তোমার মাঝে এই দোষ রয়েছে। এর নাম তিরস্কার নয়। তিরস্কার হলো, কোনো বিষয়ে কথাবার্তা চলছে। মাঝপথে আপনি এমন এক তীর্যক মন্তব্য বা কটুকথা বলে ফেললেন, যার দ্বারা ওই ব্যক্তির ওপর ঠাট্টা করা, ব্যঙ্গ করা বা বিদ্রুপ করা উদ্দেশ্য। এই ঠাট্টা-বিদ্রুপের ফলে তার মন ভাঙ্গা হয়। যা অনেক বড় গুনাহ। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পর্যন্ত বলেছেন যে, কোনো মুমিন দ্বারা এ কাজ হতে পারে না যে, সে অন্য মুমিনকে বিদ্রুপ করবে।

জবানের কারণে অন্তরে যখম সৃষ্টি হয়:

আরবি ভাষায় طعنة এর অর্থ হলে তীর মারা। আরবিতে একটি প্রসিদ্ধ পংক্তি রয়েছে-

جراحات السنان لها التيام- ولا يلتام ما جرح اللسان তীরের ক্ষত শুকিয়ে যায় তবে মুখের কথার আঘাত শুকায় না।

এজন্যে কাউকে বিদ্রুপ করে কিছু বলার দ্বারা মানুষের মনে আঘাত পায়। সে আঘাত শুকায় না। এমনিভাবে কাউকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা কিংবা কারো দিলে আঘাত লেগে যাওয়ার মতো কথাবার্তা বলা এসম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এগুলো কোনো ইমানদারের কাজ নয়।

মুমিনের জান-মাল ইজ্জত হারাম:

একজন মুসলমানের নিকট অপর মুসলমানের জান-মাল ইজ্জতের গুরুত্ব কতটুকু আমরা তা অনুভব করতে পারি না। বিদায় হজ্জের ভাষণকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন,

‘আমি যে তোমাদের সামনে কথা বলছি আজকের এই দিনটি কোনদিন?

জবাবে সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আরাফার দিন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, যে স্থানে আমি দাঁড়িয়ে আছি সেটা কোন জায়গা?

সাহাবায়ে কেরাম উত্তরে বললেন, এটা হারাম এলাকা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয় প্রশ্ন করলেন, এটা কোন মাস?

তারা জবাবে বললেন, এটা জিলহজের মাস। হুরমতওয়ালা মাস। সম্মানিত মাস।

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে লোকসকল, তোমরা জেনে রাখ, তোমাদের জান-মাল ইজ্জত এগুলো পরস্পরের জন্য হারাম। যেমনিভাবে আজকের দিনটি, আজকের এ স্থান ও এ মাস হারাম। অর্থাৎ যে সম্মান আল্লাহ তায়ালা এ স্থানকে, এ মাসকে ও এ দিনকে দিয়েছেন অনুরূপ পরস্পরের মধ্যে এমন সম্মান এবং হুরমত জান-মালের ইজ্জতের প্রতি দিয়েছেন।

ওই ব্যক্তি যেনো নিজ হাতে কাবা ধ্বংস করেছে:

হজরত আবদুলাহ বিন ওমর (রাদি.) রেওয়াত করেন যে, একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুলাহর তাওয়াফ করছিলেন। তখন তিনি কাবাকে সম্বোধন করে বলেন- হে বায়তুল্লাহ, তোমার সম্মান কতো ঊর্ধ্বে, তুমি কতই না মর্যাদাবান, সবার চোখে তুমি কী শ্রদ্ধেয়! অতপর তিনি হযজরত আবদুলাহ বিন ওমর (রাদি.)-কে জিজ্ঞেস করলেন- হে আবদুল্লাহ! আচ্ছা বলো দেখি দুনিয়াতে এমন কোনো জিনিস আছে যার মর্যাদা বায়তুল্লাহর চেয়ে বেশি? জবাবে তিনি বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তখন তিনি বললেন, আমি তোমাকে একটি জিনিস বলে দিই যার ইজ্জত ও মর্যাদা বায়তুল্লাহর হুরমতের চেয়ে বেশি মর্যাদাবান এবং হারাম। আর তা হলো এক মুসলমানের অপর মুসলমানের জান-মাল ইজ্জতের ক্ষতি করা।

মুমিনের দিল আল্লাহর নুরের ঘর তুল্য:

কাউকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা মূলত তার ইজ্জতের ওপর আঘাত করা। হজরত ডা. আবদুল হাই বললেন, মুমিনের দিল আল্লাহর নুরে প্রজ্জলিত স্থান ওই স্থানে কেবল মাত্র তাঁর জিকির, তাঁর স্মরণ, তাঁরই চিন্তা, তাঁরই মহব্বতে ভরপুর থাকবে। এমনকি সুফিয়ায়ে কেরাম মুমিনের দিলকে আরশে ইলাহীও বলে থাকেন। এই দিল আল্লাহ তায়ালার নুরের ঘর তুল্য। একজন মানুষ যতই খারাপ হয়ে থাক যদি তার অন্তরে ঈমান থাকে তা হলে সে যেকোনো সময়ে আল্লাহর মহব্বতে অবশ্যই এসে যাবে ইনশাআল্লাহ। যেহেতু এই দিলকে আল্লাহর মহব্বতের জন্য বানিয়েছেন, কাজেই কোনো মুমিনের দিল ভেঙ্গে দেয়াটা প্রকৃত বিচারে আল্লাহ তায়ালার নুরের প্রকাশস্থলের ওপর আক্রমণ করার নামান্তর। এজন্য একজন মুমিনের দিল ভাঙ্গার কারো কোনো অধিকার নেই।

কোনো মুসলমানকে খুশি করা সাওয়াবের কাজ:

যদি তুমি অন্য কোনো মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে কথা বা কাজের মাধ্যমে তাকে খুশি করতে পারো তাহলে তোমার এ আমল অনেক বড় উত্তম ও প্রতিদানযোগ্য সাওয়াবের কাজ। মাওলানা রুমি (রহ.) বলেন,

دل بدست آور كہ حج اكبر است-

কোনো মুসলমানের দিলে শান্তি দেওয়া হজ্জে আকবরের ন্যায়। আর বিদ্রুপ করা, কারো মন ভাঙ্গা এবং মুসলমানকে কষ্ট দেওয়া গুনাহ কবিরা।

একটি প্রশ্ন ও তার জবাব:

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে যে, একদিকে বলা হচ্ছে, সৎকাজের আদেশ দাও আর অন্যায় কাজে বাঁধা দাও। অপরদিকে বলা হয় মানুষের দিলে আঘাত দিয়ো না। এখন উভয়টার মধ্যে সমতা রক্ষা কী করে সম্ভব?

হ্যাঁ, সম্ভব। যখন অন্য কোনো মানুষকে কোনো কথা বলবে তখন ভালো করে ভদ্রভাবে শালীনভাবে বলবে। একাকী নরম ভাষায় মহব্বতের সঙ্গে বলবে। একাকীভাবে ডেকে বলে দাও, হে ভাই! তোমার ওই কাজটা এভাবে করলে ভালো হয়। কিন্তু জনসম্মুখে বিদ্রুপ করে উঁচু আওয়াজে বলা যার কারণে ওই ব্যক্তির মনে আঘাত পায়; এটা বড় গুনাহ ও হারাম কাজ।

এক মুমিন অপর মুমিনের আয়না স্বরূপ:

এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

المؤمن مرآة المؤمن

অর্থ: এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য আয়না স্বরূপ। যেমনিভাবে কেউ নিজের চেহারা আয়নাতে দেখার সময় চেহারাতে কোনো দাগ বা ত্রুটি দেখতে পায়। এবং তা ঠিক করে নেয়। এমনিভাবে কোনো ব্যক্তি পরস্পরের সামনে আসার পর বলে দেবে তোমার মধ্যে এ ত্রুটিগুলো রয়েছে। ঠিক করে দিও। এটাই হাদিসের উদ্দেশ্য।

আয়নার সঙ্গে উপমা দেয়ার কারণ:

এ হাদিসটুকু আমরা পড়েছি। আমাদের উস্তাদগণও তা আমাদের পড়িয়েছেন, তবে যে সকল ব্যক্তিদেরকে ইলমে হাকিকি দান করেছেন তাদের রয়েছে দূর দৃষ্টি। হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলি থানবি (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যা এভাবে করেন যে, উল্লেখ্য হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনকে আয়নার সঙ্গে উদাহরণ দিয়েছেন। লোকেরা অবশ্যই এতটুকু জানেন যে, আয়নার সামনে দাঁড়ালে ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি যেভাবে প্রকাশ পায়। আয়না তা বলে দেয়। অনুরূপ মুমিন কারো মাঝে কোনো দোষ দেখলে তা বলে দেয়। আয়নার সঙ্গে দৃষ্টান্ত দেয়ার অপর ব্যাখ্যা হলো, যেমনি করে আয়নার সামনে দাঁড়ালে আয়না সেই ব্যক্তির দোষ তাকে ছাড়া অন্য কাউকে প্রকাশ করে না। অনুরূপ একজন মুমিন ব্যক্তির এমন হওয়া চাই। কারো দোষ-ত্রুটি দেখলে মহব্বতের সঙ্গে আপসে গোপনে তাকে বলে দেবে। কোনো কিছুতেই অন্য কারো কাছে ওই ব্যক্তিকে খাটো করার জন্য হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য তার দোষগুলো প্রকাশ করবে না। এটা মুমিনের কাজ নয়।

ভুল ধরিয়ে দিতে গিয়ে অপমান করবে না:

এ কারণে এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয় বিষয় জানিয়ে দিয়েছেন যে, মুমিনের কাজ হলো, যদি সে অন্য মুমিনের মাঝে কোনো ভুল দেখে তাহলে তাকে বাতলে দেবে। দ্বিতীয় বিষয় হলো, কারো ভুল সংশোধন করতে গিয়ে অন্য কারো সামনে তাকে অপমান কর না। তার দোষ-ত্রুটিগুলো অন্য কারো কাছে প্রকাশ কর না।

ঠাট্টা একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে:

বর্তমানে আমাদের সামাজিক পরিবেশে পরস্পরকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অত্যন্ত সাজিয়ে গুছিয়ে মানুষকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়। অথচ এর দ্বারা অন্যের অন্তর ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যায়। সেদিকে কারো খেয়াল নেই।

আম্বিয়া আলাইহিস সাল্লাম ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও তিরস্কার করেননি:

মুফতি শফি সাহেব (রহ.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা প্রায় এক লাখ চব্বিশ হাজার পয়গম্বর দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। তারা সকলে আল্লাহ তায়ালার দীনের দাওয়াত দিয়েছেন। তাদের ব্যাপারে এধরনের কোনো কথা জানা যায়নি যে, তারা বিপরীত ধর্মের কোনো কাফের মুশরিককে তিরস্কার কিংবা বিদ্রুপ করেছেন। বরং তারা যা কিছু বলতেন, অত্যন্ত মহব্বতের সঙ্গে বলতেন। যেন তাকে উদ্দেশ্য করে অন্যদেরও বুঝে এসে যায়।

আজ-কাল ঠাট্টা করা ও ব্যঙ্গ করা সাহিত্যের শিল্পে পরিণত হয়ে গেছে। যখন কারো মাঝে সাহিত্যচর্চার আবেগ উথলে ওঠে অথবা জনপ্রিয় বক্তা হওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়, তখন সে তার নিবন্ধের মাঝে বা তার বক্তৃতার মাঝে এই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক তীর্যক কথনকে আবশ্যিক অনুষঙ্গ বানিয়ে ফেলে।

তিরস্কারের জবাব তিরস্কার নয়:

তিরস্কারের জবাব তিরস্কার দ্বারা দেয়া যদিও শরিয়তে অনুমোদিত, তবু দেখা যায় হজরত আম্বিয়া আলাইহিস সালাম ও তার ওয়ারিসগণ এমনটা করেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম এই অধিকারটুকও কখনো প্রয়োগ করেননি। বরং ক্ষমা করে দিতেন। এটা ছিল তাঁর (সা.) এর আদর্শ। সকল আম্বিয়া আলাইহিস সালামও এমন আদর্শবান ছিলেন। প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা কর:

কেউ যদি তোমাকে গালি দেয় তাতে তোমার কিইবা ক্ষতি? তোমার কী আখেরাত নষ্ট হবে? বরং গালির বিপরীতে তাকে তুমি ক্ষমা করে দিলে তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সাল্লাম ইরশাদ করেন, যেব্যক্তি অন্যকে ক্ষমা করে দিলো আল্লাহ তাকে ওই দিন ক্ষমা করে দেবেন যেদিন ক্ষমার জন্য সকলে মুখাপেক্ষী হবে। তাই প্রতিশোধ গ্রহণ করার মানসিকতা ছেড়ে দেওয়া উচিত।

মহান রাব্বুল আরামিন আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
 কুষ্টিয়ার  বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর