শনিবার   ০৩ ডিসেম্বর ২০২২   অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৯   ০৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
সর্বশেষ:
বিজয়ের মাসকে ‘মুক্তিযোদ্ধা মাস’ ঘোষণার দাবি দেশে করোনার টিকার চতুর্থ ডোজ দেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী পাঁচ বছরের মধ্যে সারাদেশে বিদ্যুতের তার মাটির নিচে যাবে সারা দেশে পুলিশের পক্ষকালব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু কুষ্টিয়ায় খেজুরের রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি ঢাকায় অগ্নিসন্ত্রাসীদের বিশৃঙ্খলার লাইসেন্স দেয়া হবে না পদ্মা সেতুর সুফল পেতে শিল্পকারখানার প্রত্যাশা
২৪৩৫

বিদেশি পর্যটকদের ভিড় ‘আলপনা গ্রামে’

নিউজ ডেস্ক:

প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল ২০১৯  

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট্ট গ্রাম টিকইল। এখানকার বেশির ভাগ বাড়িই মাটির। কোনটা একতলা, কোনটা দোতলা। অধিকাংশ বাড়িতেই দেখা মেলে রঙের ছটা। গ্রামের প্রতিটি দেয়ালই এক একটি ক্যানভাস আর মানুষগুলো আলপনার কারিগর। আর এ কারণেই টিকইল নয়, ‘আলপনা গ্রাম’ নামে এর পরিচিতি এখন দেশজুড়ে।

তেভাগা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেত্রী ইলা মিত্রের স্মৃতিধন্য নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের গ্রাম টিকইল। হিন্দু-অধ্যুষিত এ গ্রামের প্রতিটি বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে শোভা পায় হাতে আঁকা নানা আলপনা। টিকইল গ্রামের আলপনার মূল কারিগর হচ্ছেন এ গ্রামের গৃহিণী আর মেয়েরা। বংশ পরম্পরায় বছরের পর বছর বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন তারা।

 নির্জন গ্রামটির প্রত্যেকটা মাটির বাড়ির দেয়ালে লেখা আছে অজস্র গল্প

নির্জন গ্রামটির প্রত্যেকটা মাটির বাড়ির দেয়ালে লেখা আছে অজস্র গল্প

নির্জন গ্রামটির প্রত্যেকটা মাটির বাড়ির দেয়ালে লেখা আছে অজস্র গল্প। কোনো কোনো গল্পের রং নীল, কোনটির-বা হলুদ। আবার কোনো কোনো দেয়ালের গল্পগুলো শুধু লাল আর সাদা। এই গল্পগুলো তাদের জীবনের কথা বলে, বলে তাদের ধর্মীয় উৎসবের কথা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে মাটির বুকে সেঁটে থাকা এসব গল্পের পরিচয় এই গ্রামের সহজ-সরল মানুষের শৈল্পিক মন। চামড়া কুঁচকে যাওয়া যে হাত দুটো রোজ সংগ্রাম করে দারিদ্রতার সঙ্গে, সেই হাতই আবার রং-তুলি ধরতে জানে, জানে কোন রঙের পর কোন রং দিলে মাটির বুকে জেগে উঠবে তাদের জীবনের গল্প।

জানা যায়, বাড়ির দেয়ালে আলপনা এই গ্রামে নতুন কিছু নয়। প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে হিন্দু বাড়িগুলোতে এই সংস্কৃতি চলে আসছে। তাই আল্পনায় স্থান পায় ধর্মীয় নানা চিহ্ন, কথামালা। একসময় বিভিন্ন তিথি-উৎসবে মাটির দেয়ালের পাশ দিয়ে তিনটি ফোঁটা দিয়ে নিচের দিকে সাদা রঙের আলপনা টেনে দেয়া হতো। এখন আর তিন ফোঁটার টান নয়, আঁকা হচ্ছে ফুল, পাখি, আকাশ, নদীসহ বাংলার চিরায়ত ছবি। এর কেউ চারুকলার শিক্ষার্থী নয়, নিজেদের সৃজনশীল প্রচেষ্টাকেই রঙিন হয়ে উঠেছে দেয়াল।

আলপনার মূল কারিগর হচ্ছেন এ গ্রামের গৃহিণী আর মেয়েরা

আলপনার মূল কারিগর হচ্ছেন এ গ্রামের গৃহিণী আর মেয়েরা

আলপনা আঁকতে তারা নিজেদের তৈরি করা রঙ ব্যবহার করেন। এখানকার মাটির ঘরে আলপনা করার রঙয়ের উৎসও মাটি। গ্রামবাসীর ভাষ্যমতে আগে গৃহিণীরা আলপনা আঁকতে গিরিমাটি, চক (খড়িমাটি), রং, তারপিন তেল ব্যবহার করতো। তবে ওইসব উপকরণে আঁকা আল্পনা বেশিদিন স্থায়ী হতো না। তাই বর্তমানে শুকনা বরই চুর্ণ আঠা, গিরিমাটি, আমের পুরাতন আঁটির শাঁস চুর্ণ, চকগুঁড়া, বিভিন্ন রং, মানকচু ও কলাগাছের কস দিয়ে তৈরি রংয়ের মিশ্রণ অন্তত ৪/৫ দিন ভিজিয়ে রেখে আলপনা আঁকা হয়। এ কারণে প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হয় এসব আলপনা।

গ্রামের দাসু বর্মণের বাড়িতে রয়েছে একটি পরিদর্শন খাতা। সেখানে ঘুরতে আসা মানুষরা তাদের মন্তব্য লিখে যান। খাতা ঘেটে দেখা গেল, বিদেশী পর্যটকও এসেছেন এই গ্রামে। সুইজারল্যান্ডের এক আলোকচিত্রী লিখেছেন, অসামান্য আতিথেয়তা, চমৎকার গ্রাম, বিস্ময়কর মানুষ, চমৎকার আলপনা। অস্ট্রেলিয়ার জিওনস নামের পর্যটক তাতে লিখেছেন, এটা বাংলাদেশের সম্পদ। একে আরো বড় প্রচার দরকার, যত্নে সংরক্ষণ করা উচিত। অপূর্ব।

নিজেদের তৈরি রং দিয়ে আঁকা হয় আলপনা

নিজেদের তৈরি রং দিয়ে আঁকা হয় আলপনা

গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই দেখা যায় লাগোয়া দেয়ালে রঙিন হয়ে আছে আবহমান বাংলার রূপ। মাটির বসতঘর, বৈঠক ঘর ও রান্নাঘরের ভিতরের-বাইরের দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের ফুল, পশু-পাখি, শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এমনকি বিভিন্ন দেব-দেবীর ছবি এবং হিন্দুধর্মীয় শ্লোক দেখা গেছে।

টিকইল গ্রামের মৃত নরেশের স্ত্রী প্রভাতী বালা এখনো নিজ হাতে মনের মাধুরী মিশিয়ে ধর্মীয় শ্লোক ও আলপনা আঁকেন। তিনি বলেন, এতে যেমন বাড়িঘরে পবিত্রতা আসে ঠিক তেমনি পরিবারের সবার মনে বাড়িঘরে আনন্দ লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়। গ্রামের নারীরা আজও আলপনা আঁকার চর্চাটি ধরে রেখেছেন। আগামী প্রজন্মেও এর ধারা অব্যাহত রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
 কুষ্টিয়ার  বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর