শুক্রবার   ০৭ অক্টোবর ২০২২   আশ্বিন ২২ ১৪২৯   ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
সর্বশেষ:
দেশের পাহাড়ী এলাকায় কফি চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে শুরু হয়েছে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল সাজেকে পর্যটকের ধুম, কোনো রুম ফাঁকা নেই ভোক্তা পর্যায়ে এখনই বাড়ছে না বিদ্যুতের দাম দলে যাগ দিয়েছেন সাকিব, নিউজিল্যান্ডে পরিপূর্ণ টিম কুষ্টিয়ায় প্রবীণদের মাঝে উপহার সামগ্রী বিতরণ
২৬০৯

কুষ্টিয়ায় রয়েছে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা

নিউজ ডেস্ক:

প্রকাশিত: ২২ মার্চ ২০১৯  

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবের এক সোনালি নাম কুষ্টিয়া। জগৎখ্যাত মনীষীদের পদচারণে ধন্য কুষ্টিয়ার মাটি। একসময়ের সাংস্কৃতিক রাজধানীখ্যাত এ জেলায় জন্ম নিয়েছেন অনেক বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, ক্রীড়াবিদসহ অসংখ্য গুণীজন।

প্রাচীনকাল থেকেই কুষ্টিয়ার রূপ-রস আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক বিশ্বখ্যাত পর্যটক, মনীষী ছুটে এসেছেন এ জনপদে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক মীর মশাররফ হোসেন, মরমী সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহসহ বিশ্বখ্যাত মনীষীরা নিবাস গড়ে তোলেন এখানে। তাই ভ্রমণপিপাসুদের অনেকেরই পছন্দ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের লীলাভূমি কুষ্টিয়া। বছরের বেশিরভাগ সময় জেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেশি-বিদেশি পর্যটকের পদচারণে মুখর থাকে। দেশের বিভিন্ন স্থানের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখানে ভ্রমণে আসেন। সারা বছর দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনায় মুখর থাকে কুষ্টিয়া।

শিলাইদহের কুঠিবাড়ি: কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহে অবস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি। বছরজুড়ে দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটক বেড়াতে আসেন এখানে। কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত স্থান এই শিলাইদহ। কুঠিবাড়ির উত্তরে পদ্মা আর দক্ষিণে গড়াই নদী। কুঠিবাড়ির দোতলা থেকে প্রমত্তা পদ্মা সহজে চোখে পড়ে। কুমারখালী থেকে শিলাইদহের দূরত্ব মাত্র পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার। এই নিভৃত পল্লিগ্রামের সংস্পর্শে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রতিভার বিচিত্র বিকাশ সাধন করেছেন।

গোপীনাথবাড়ি: শিলাইদহের গোপীনাথবাড়ি
ইতিহাস-ঐতিহ্যের শেষ স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে এখনও বর্তমান। রাজা-রাজড়া ও সামন্ত প্রভুদের কাহিনিগাথায় ভরপুর গোপীনাথবাড়ি। কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের শিলাইদহ ইউপির খোরশেদপুর বাজার সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী এ বাড়িটি ঘিরে রয়েছে নানা ইতিহাস। প্রতিদিন যেসব দর্শনার্থী রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে যান, তাদের অধিকাংশ ঘুরেফিরে দেখেন রানি ভবানী, প্রিন্স দারকানাথ ঠাকুরের স্মৃতিখ্যাত গোপীনাথবাড়ি। নির্জন, সুনসান বাড়িটির নীরবতার মাঝে পর্যটকরা খুঁজে পান ইতিহাসের গন্ধ। নোনাধরা বাড়ি, পুরোনো দেয়াল, প্রাচীন মন্দির ও বিশাল জলাশয় ধারণ করে আছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন স্মৃতি। সব মিলে শিলাইদহের বাড়িটি পরিণত হতে পারে পর্যটকের তীর্থস্থানে। কুমারখালী উপজেলা সদরের ১০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে পদ্মাপ্রবাহ চুম্বিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি সংলগ্ন গোপীনাথবাড়ির সুবিশাল আঙিনা। ছয় দশমিক ৮৭ একর জমির ওপর রানি ভবানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গোপীনাথ দেবের এই মন্দির ও আশ্রমবাড়ি। স্থাপত্য আর নির্মাণশৈলীর বিবেচনায় সৌন্দর্যের কোনো ঘাটতি ছিল না এখানে।

টেগর লজ ও মোহিনী মিলস: কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় অবস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান টেগর অ্যান্ড কোম্পানির শাখা অফিস টেগর লজ। কবিগুরু কলকাতা থেকে শিলাইদহে আসার পথে এ লজে বিশ্রাম নিতেন। শহরের পূর্বে মিলপাড়ায় অবস্থিত লাল দ্বিতল ভবনটি কবিপ্রেমীদের আজও আকৃষ্ট করে। দ্বিতল ভবন টেগর লজ। এর পেছনে রয়েছে অবিভক্ত বাংলার প্রথম ও প্রধান বস্ত্রকল ‘মোহিনী মিলস’। এক যুগের বেশি সময় ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে মিলটি। কথিত আছে, একসময় মোহিনী মিলের হুইসেলের শব্দ শুনে এলাকাবাসী তাদের প্রাত্যহিক কাজকর্ম শুরু করত।
রেনউইক বাঁধ: শহরের গড়াই নদী সংলগ্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আখ মাড়াই কলের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা ছিল রেনউইক অ্যান্ড যজ্ঞেশ্বর কোম্পানি। ছায়াঘেরা সুন্দর পরিবেশের এ কোম্পানির শেষ প্রান্তে নদীর তীরে গড়ে তোলা হয়েছে শহররক্ষা ‘রেনউইক বাঁধ’। শত শত মানুষ এখানে বেড়াতে আসে। চাইলে নৌভ্রমণ করতে পারেন পর্যটকরা।

কাঙাল কুটির: শহর থেকে ৪০ মিনিটের দূরত্ব কুমারখালী উপজেলার। উপজেলা শহরের মাঝামাঝিতে এর অবস্থান। কুষ্টিয়ার প্রথম সংবাদপত্র ‘গ্রামবার্তা’র সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের বাড়ি এ ‘কাঙাল কুটির’। ১৮৬৩ সালে কুমারখালীর বাংলা পাঠশালার প্রধান শিক্ষক কাঙাল হরিনাথ এমএন প্রেস থেকে এ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। গ্রামবার্তায় নীলকরসহ অত্যাচারী জমিদার ও লাঠিয়ালদের বিরুদ্ধে কাঙাল হরিনাথ কলম ধরেছিলেন।
বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের মাজার: কুষ্টিয়ার কুমারখালীর আরেকটি দর্শনীয় স্থান হলো বাউল সম্রাট লালন শাহের মাজার। প্রতিদিন লালনের মাজার দর্শনে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটক ও ভক্তরা আসেন। লালন শাহের সমাধিস্থলের পাশে রয়েছেন তার নিজ হাতে মুরিদ হওয়া শিষ্যদের সমাধি। লালন শাহ বাউল সাধনার প্রধান গুরু, বাউল গানের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা ও গায়ক।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী লালন সাঁই একাধারে একজন আধ্যাত্মিক বাউল সাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, অসংখ্য গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন। লালনকে বাউল গানের একজন অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার গানের মাধ্যমেই উনিশ শতকে বাউল গান বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাকে ‘বাউল সম্রাট’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। আধ্যাত্মিক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ প্রায় দুই হাজার গান রচনা করেন। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের পয়লা কার্তিক (১৭ অক্টোবর, ১৮৯০) তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা: কুমারখালীতে আরও একটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এটি হলো লাহিনীপাড়া গ্রামে অবস্থিত ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা। প্রতিদিন এখানে শত শত দেশি-বিদেশি পর্যটক আসেন। ১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর লাহিনীপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জš§ নেন তিনি। মীর মশাররফ ছিলেন বঙ্কিমযুগের অন্যতম প্রধান গদ্যশিল্পী ও উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের পথিকৃৎ। বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশ নন্দিনী প্রকাশের প্রায় চার বছর পর ১৮৬৯ সালে মশাররফের প্রথম উপন্যাস রতœবর্তী প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি একে একে কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, আত্মীজীবনী, পাঠ্যপুস্তক প্রভৃতি বিষয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন।

গগন হরকরা: গগন চন্দ্র দাস বাংলা লোকসংগীতশিল্পী ও সংগীত রচয়িতা। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’র সুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংগ্রহ করেছিলেন গগন হরকরা রচিত একটি গানের সুর থেকে। গগন হরকরা ছিলেন বিশিষ্ট বাউল গীতিকার। জন্ম অধুনা বাংলাদেশের শিলাইদহের নিকটস্থ আড়পাড়া গ্রামে। শিলাইদহ ডাকঘরে চিঠি বিলি করতেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গুণমুগ্ধ ছিলেন।

রাধা বিনোদ পাল: জন্ম ১৮৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি। মৃত্যু ১৯৬৭ সালের ১০ জানুয়ারি। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি যুদ্ধাপরাধীর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দূরপ্রাচ্যের ট্রায়ালের আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতের বিচারক ছিলেন তিনি। জাপানিদের ইতিহাসে রাধা বিনোদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ১৮৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি দৌলতপুর উপজেলার মধুরাপুর ইউনিয়নের তারাগুনিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। এরপর মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়নের ছাতিয়ান গ্রামের গোলাম রহমান পণ্ডিতের কাছে শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি তার।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ: ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় উপমহাদেশের রেল যোগাযোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পদ্মা নদীর ওপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণ করে। ব্রিজটিতে ১৫টি স্প্যান রয়েছে, যার প্রতিটি বিয়ারিং টু বিয়ারিংয়ের দৈর্ঘ্য ৩৪৫ ফুট দেড় ইঞ্চি, উচ্চতা ৫২ ফুট। একেকটি স্প্যানের ওজন এক হাজার ২৫০ টন। রেললাইনসহ এক হাজার ৩০০ টন। এছাড়া দু’পাশে ল্যান্ড স্প্যানও রয়েছে যার দূরত্ব ৭৫ ফুট। ব্রিজটির দৈর্ঘ্য পাঁচ হাজার ৮৯৪ ফুট (এক মাইলের কিছু বেশি)। ব্রিজ নির্মাণে ইটের গাঁথুনি দুই লাখ ৯৯ হাজার টন। ইস্পাত ৩০ লাখ টন। সাধারণ সিমেন্ট এক লাখ ৭০ হাজার ড্রাম। কিল্ড সিমেন্ট (বিশেষ আঠাযুক্ত) লাগানো হয় ১২ লাখ ড্রাম। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের এক হাজার গজ ভাটি থেকে ছয় কিলোমিটার উজান পর্যন্ত ১৬ কোটি ঘনফুট মাটি ও দুই কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার ঘনফুট পাথর ব্যবহার করে গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হয়। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা-পাবনার পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণ করার সময় দু’পাশে বাঁধ দিয়ে এক দশমিক ৮১ কিলোমিটার নদী সংকুচিত করা হয়। ২৪ হাজার ৪০০ শ্রমিক পাঁচ বছর নিয়োজিত ছিলেন এর নির্মাণকাজে। ১৯১৪ সালের শেষদিকে ব্রিজটি উদ্বোধন হয়।

লালন শাহ সেতু: হার্ডিঞ্জ ব্রিজের অদূরে পদ্মা নদীর ওপর নির্মাণ করা হয় লালন শাহ সেতু। সেতুটির দৈর্ঘ্য এক দশমিক আট কিমি। প্রস্থ ১৮.১০ মিটার। সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০৩ সালে। চীনের প্রতিষ্ঠান মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো এটি নির্মাণ করে। সেতুটিতে চারটি লেন রয়েছে। স্প্যানের সংখ্যা ১৭। ২০০৪ সালের ১৮ মে সেতুটি সম্পূর্ণ যান চলাচলের জন্য উম্মুক্ত করা হয়। সেতুটি কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহের যোগাযোগব্যবস্থা সহজতর করেছে।

ঝাউদিয়া শাহি মসজিদ: দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন কুষ্টিয়ার ঝাউদিয়া জামে মসজিদ। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে কুষ্টিয়া সদরের ঝাউদিয়া ইউনিয়নের জমিদার আহমেদ আলী সুফি নিজ বাড়িতে এই ঐতিহাসিক শাহি মসজিদটি নির্মাণ করেন। কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বৃত্তিপাড়া থেকে হেঁটে এ মসজিদে যাওয়া যায়। আজও এর স্থাপত্যকলা ও নির্মাণকৌশল দেশি-বিদেশি পর্যটককে আকর্ষণ করে। মসজিদটি ইট, পাথর, বালু ও চীনামাটির গাঁথুনি দিয়ে তৈরি। মসজিদের উপরিভাগে পাঁচটি গম্বুজ ও ভেতরে দুটি দরজা রয়েছে। অপূর্ব কারুকাজ পুরো মসজিদজুড়ে। যে কেউ দেখলে মুগ্ধ হয়ে যান।

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
 কুষ্টিয়ার  বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর