মঙ্গলবার   ১৭ মে ২০২২   জ্যৈষ্ঠ ২ ১৪২৯   ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
সর্বশেষ:
চুয়াডাঙ্গায় ভুয়া ডাক্তারকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার টন এবার হজ কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পেল ৭৮০ এজেন্সি আগামী দুই বছরের মধ্যে পৃথিবী হবে ডাটানির্ভর ডিজিটালের পরবর্তী পদক্ষেপ স্মার্ট বাংলাদেশ
১৭৬৫

কাঁচাগোল্লার খোঁজে নাটোরে

লাইফস্টাইল

প্রকাশিত: ৪ জানুয়ারি ২০১৯  

নাটোরের কাঁচাগোল্লা বিখ্যাত দেশজুড়ে। সুস্বাদু মিষ্টি ‘নাটোরের কাঁচাগোল্লা’ নামে এর মোহনীয়তা আছে। দুর্নিবার আকর্ষণ আছে কাঁচাগোল্লায়। নাটোর দিয়েই রেলপথে যাতায়াত করি। আর আমার চাকরির প্রথম কর্মস্থল ছিল নাটোর

ঐতিহ্যের খোঁজে আর মিষ্টতার টানে গেল বছর ১৫ ডিসেম্বর পৌঁছে গেলাম নাটোর। ট্রেনে আরামদায়ক ভ্রমণ হয়। ফলে ট্রেন ভ্রমণই বেছে নিলাম। ভোরে পৌঁছে গেলাম নাটোরে। এরপর নাশতা সেরে নিলাম স্টেশনসংলগ্ন হোটেল থেকে। তারপর সকাল ৭টায় রওনা দিলাম রাজশাহীর ‘পুঠিয়া রাজবাড়ী’র উদ্দেশে। রাজবাড়ী দেখে ১৮ কিমি দূরের নাটোর বাইপাসে পৌঁছে রিকশায় কালীবাড়ীর উদ্দেশে রওনা হই। বাইপাস থেকে অটোয় নিচাবাজার এলাম। নাটোরের নিচাবাজার থেকে ডানের স্বর্ণপট্টির আঁকাবাঁকা চিকন গলিপথ দিয়ে যাওয়া যাবে আদি কাঁচাগোল্লার কারখানা ও বিক্রয় কেন্দ্রে। আবার নাটোর-বগুড়া রোডের শহরের কাছাকাছি ভবানীগঞ্জের মোড় থেকে আঁকাবাঁকা গলিপথ দিয়ে অথবা রানীভবানীর রাজপ্রাসাদ দেখে গলিপথে রিকশাযোগে জয়কালীবাড়ী যাওয়া যায়। জয়কালীবাড়ীর মন্দিরসংলগ্ন লালবাজারে ঐতিহ্যবাহী আদি কাঁচাগোল্লার কারখানা।

৪-৫ ঘণ্টা ঘুরে জয়কালীবাড়ী-সংলগ্ন কারখানা বা বিক্রয় কেন্দ্রে পর্যবেক্ষণ করলাম। দেখা গেল প্রচণ্ড ভিড় লেগেই আছে। কর্মচারীরা কথা বলার সময় পাচ্ছেন না। ক্রেতারা মন্দির বা বিভিন্ন মানতের জন্য ৯, ১৮, ২১, ৫০ টাকার কাঁচাগোল্লা নিচ্ছেন। কাঁচাগোল্লার পাশাপাশি সন্দেশও বিক্রি হয় এখানে। নিচাবাজার স্বর্ণপট্টি মোড়ে (কালীবাড়ী যাওয়ার গলিপথ) মৌচাক মিষ্টান্ন ভাণ্ডারেও প্রচুর কাঁচাগোল্লা বিক্রয় হচ্ছে। কর্মচারী শ্যামল বলেন, প্রতিদিন বিক্রির পরিমাণ একই রকম হয় না। কম-বেশি হয়। বিক্রি লাখ টাকার কাছে পৌঁছে যায় প্রায় প্রতিদিন। পূজা-পার্বণে অনেক কাঁচাগোল্লা বিক্রি হয়। ২০-২৫ জনের কর্মচারী/কারিগর তখন হিমশিম খায়। সে সময় বিক্রির পরিমাণ কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হয়।

কাঁচাগোল্লা সৃষ্টির পেছনে আগের এক মজার জনশ্রুতি আছে। অপচয় হওয়ার ভয়ে একান্ত বাধ্য হয়েই নাকি তৈরি হয়েছিল এ মিষ্টি। নাটোর শহরের লালবাজারের মধুসূদন পালের দোকান ছিল নাটোরের প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান। এখানে প্রচুর বিক্রি হতো মিষ্টিসামগ্রী। মিষ্টিসামগ্রী তৈরির জন্য সেখানে বেশকিছু বড় চুলা ছিল। মধুসূদন এসব চুলায় চাহিদা মোতাবেক ছানা দিয়ে রসগোল্লা, পানিতোয়া, চমচম, কালো জাম প্রভৃতি মিষ্টি তৈরি করতেন। যেহেতু অনেক বিক্রি হতো, তাই ১০-১৫ কর্মচারীর মাধ্যমে দোকানে মিষ্টিসামগ্রী তৈরি ও বিক্রি করতেন তিনি। কোনো একদিন দু-তিন মণ ছানা তৈরি করে। কিন্তু কারিগর আসেনি। মধুসূদন চিন্তায় পড়ে গেলেন। বিপুল পরিমাণ ছানা এখন কী হবে! এ ভেবে মাথা নষ্ট! হঠাৎ মাথায় চিন্তা ঢুকে গেল। এত টাকার জিনিস তো নষ্ট করা যায় না! তাই নষ্টের হাত থেকে রক্ষা পেতে ছানার ভেতর চিনির রস ঢেলে জ্বাল দিতে বললেন কর্মচারীদের। ঠাণ্ডা করে নামিয়ে রাখতে বললেন। এরপর সৃষ্টি হলো ইতিহাস।

তৈরি হলো চমত্কার স্বাদের এক মিষ্টি! মধুসূদন নতুন এ মিষ্টির নাম রাখলেন কাঁচাগোল্লা। বিখ্যাত হয়ে এখন দেশের বাইরেও একটি ব্র্যান্ড হয়েছে ‘নাটোরের কাঁচাগোল্লার’। ১৭৬০ সালে রানী ভবানীর রাজত্বকালে কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়াতে থাকে। সে সময় নাটোরে মিষ্টির দোকান ছিল খুব কম। এসব দোকানে বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা ছাড়াও অবাক সন্দেশ, রাঘবশাহী, চমচম, রাজভোগ, রসমালাই, পানিতোয়া প্রভৃতি মিষ্টি ছিল অন্যতম। তবে এর মধ্যে সবার শীর্ষে উঠে আসে কাঁচাগোল্লা। ফলে সে সময় জমিদারদের মিষ্টিমুখ করতে ব্যবহার হতো এ বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা। এমনকি বিলাতের রাজপরিবার পর্যন্ত এ কাঁচাগোল্লা যেত। আরো যেত কলকাতাসহ পুরো ভারতবর্ষে।

রাজশাহী গেজেট পত্রিকায় কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতির কথা বলা হয়েছে। কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সে সময় কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি নিয়ে লেখালেখি হয়েছে। কলকাতা এবং নাটোর শহর একই সময় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এবং এ দুই শহরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সর্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকায় ভারত, ইংল্যান্ডসহ তত্কালীন বিভিন্ন রাষ্ট্রে নাটোরের কাঁচাগোল্লার কথা ছড়িয়ে পড়ে। কালক্রমে ‘নাটোরের কাঁচাগোল্লা’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

কাঁচাগোল্লার দাম: প্রতি কেজি কাঁচাগোল্লা বিক্রিয় হচ্ছে ৪০০ টাকা দরে। একটু বেশি কিনলে দাম কমও হতে পারে।

পার্শ্ববর্তী দর্শনীয় স্থান: শহরের কাছেই বা কাঁচাগোল্লা কারখানা থেকে রিকশাপথে ১০ টাকা প্রবেশ ফিতে রানী ভবানীর রাজবাড়ী (নাটোরের রাজবাড়ী) দেখতে পারেন। শহর থেকে বগুড়ার দিকে যেতে তিন কিমি দূরে রিকশা/অটোযোগে যেতে পারেন ‘উত্তরা গণভবন’। অথবা রাজশাহী রোডে ১৬-১৭ কিমি দূরের রাজশাহীর ‘পুঠিয়া রাজবাড়ী’ দেখতে পারেন।

থাকা ও খাওয়া: নাটোরে থাকা ও খাওয়ার কোনো সমস্যা নেই। থাকা ও খাওয়ার জন্য সব দাম ও মানের আবাসিক হোটেল পাবেন। আপনার পছন্দ ও বাজেট অনুযায়ী স্টেশন/বাজারসংলগ্ন যেকোনো হোটেল বেছে নিতে পারেন।

কীভাবে যাবেন: নাটোর যাওয়া খুবই সহজ। ঢাকা থেকে নাটোর/রাজশাহী/দক্ষিণবঙ্গগামী বাসে নাটোরে নামতে হবে অথবা যেকোনো প্রান্ত থেকে বাসে নাটোরে নামা যাবে। উত্তর/দক্ষিণ/ঢাকা থেকে ট্রেনযোগে নাটোর স্টেশনে নামতে হবে। এরপর অটো বা রিকশাযোগে উল্লিখিত সব স্পটে যাওয়া যাবে।

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
 কুষ্টিয়ার  বার্তা