বৃহস্পতিবার   ০২ ডিসেম্বর ২০২১   অগ্রাহায়ণ ১৭ ১৪২৮   ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
সর্বশেষ:
রূপান্তরে বাংলাদেশ উত্তরণে বাংলাদেশ দুটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পে ২৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে জাপান শতবর্ষ উদযাপনে বর্ণিল সাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যশোরে আনসার-ভিডিপি’র পতাকা র‌্যালি করোনা বাড়লে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবার বন্ধ হবে: প্রধানমন্ত্রী ভারত-পাকিস্তান থেকে নানা সূচকে এগিয়ে বাংলাদেশ
১০৭

ফুল ব্যাগে ভাগ্যবদল; কুমারখালী দুই বন্ধুর

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ নভেম্বর ২০২১  

কাপুর, ফাইবার, কভার ও ফোম দিয়ে সেলাই করে তৈরি হচ্ছে ফুল ব্যাগ। আকার ও আকৃতিভেদে ব্যাগগুলো তৈরি হচ্ছে। দামেও বেশ সহজলভ্য। ব্যাগগুলো সহজেই ধোয়া ও ব্যবহার করা যায়। টিকেও বেশি দিন। তাই দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ব্যাগগুলো। 

কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের তেবাড়িয়া এলাকায় দুই বন্ধু মিলে গড়ে তুলেছেন ব্যাগ তৈরির কারখানা। যেটি স্থানীয়ভাবে ‘ফুলব্যাগের কারখানা’ নামে পরিচিত। উৎপাদিত ব্যাগগুলো স্থানীয় ও জেলার চাহিদা মিটিয়ে এগুলো চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। অনলাইনেও পাওয়া যায় এখানকার ব্যাগ।

অসহায়, বিধবা ও স্বামী-পরিত্যক্তা ও সুবিধাবঞ্চিত নারীরা এই ব্যাগ তৈরির কাজ করেন। তাদের পাশাপাশি পুরুষরাও করছেন এ কাজ। এতে একদিকে যেমন তারা স্বাবলম্বী হচ্ছেন, অন্যদিকে তাদের উৎপাদিত ব্যাগ স্থানীয় ও দেশীয় বাজারে চাহিদা পূরণ করছে।

ফুলব্যাগে ভাগ্যবদলের খবর পেয়ে সোমবার (১৫ নভেম্বর) দুপুরে পরিদর্শন যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিতান কুমার মন্ডল। এ সময় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাহমুদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

শুরুর কথা, ২০১৮ সালের শেষের দিকে পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের তেবাড়িয়া এলাকায় ফুলব্যাগ তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন দুই বন্ধু মিঠুন বিশ্বাস (২৫) ও নিমাই কর্মকার (২৪)। সে সময় দুই বন্ধু প্রতি মাসে ১ হাজার থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ পিস ব্যাগ তৈরি করতেন। প্রতিটি ব্যাগ তৈরিতে খরচ হয় ১০০ থেকে ১২০ টাকা। আর বিক্রি করা হয় ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা।

জানা গেছে, বর্তমানে মিঠুন ও নিমাইয়ের সঙ্গে কাজ করেন আরও ১৭ জন কারিগর। সবাই মিলে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার ফুল ব্যাগ তৈরি করেন, যার বাজার মূল্য প্রায় আট লাখ টাকা। প্রত্যেক কারিগর প্রতি মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন।

কুমারখালী পৌরবাজারের কসমেটিকস ব্যবসায়ী বিশ্বনাথ বলেন, হাতে তৈরি পণ্যগুলো সব সময় ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। ফুল ব্যাগেও বেশ আকৃষ্ট হচ্ছে ক্রেতারা। দেখতে সুন্দর, কালারফুল, পরিবহন সহজ ও সুলভমূল্য হওয়ায় বেচা-বিক্রি বেশি হয়।

মমিনুল ইসলাম নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ফুল ব্যাগগুলো অল্প দামে পাওয়া যায়। বেশি বিক্রির পরিকল্পনা করেই আমরা এগুলো তৈরি করি। পণ্যের মান ঠিক রেখে ভালো ও মজবুত ব্যাগ সবার হাতে পৌঁছে দিতে পেরে আমরাও খুশি।

কয়েক বছর আগে পারিবারিক কলহের জেরে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ করে সমাপ্তি টানেন। বর্তমানে তিনি বাবার বাড়িতে বসবাস করেন। তার কোনো সন্তান নেই। কিন্তু বাবার সংসারে নিজেকে বোঝা মনে করে বসে না থেকে লেগে পড়েন ব্যাগ তৈরির কারখানায়। এখন তিনি কারিগর হিসেবে কাজ করছেন।

ডলি বলেন, দেশে ফুল ব্যাগের চাহিদা অনেক। গুণগত মান ভালো হওয়ায় দিন দিন চাহিদা বেড়েই চলেছে। এই কাজ করে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করা সম্ভব। প্রতি মাসে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা আয় করি। আগে অভাব থাকলেও এখন পরিবার নিয়ে সুখে দিন যাচ্ছে।

একসময় বেকার যুবক হারুণ কোন কাজ না করে ঘুরেফিরে সময় কাটাতেন। এখন তিনিও ফুল ব্যাগের কারখানা কাজ করেন। শুধু তিনি নয়, তার পরিবারের সদস্যরাও তার সঙ্গে এ কাজে যোগ দেন। হারুন শেখ বলেন, এই কাজ করে প্রতিদিন হাজার টাকা ইনকাম করা যায়। বাড়ির সবাই মিলে এই কাজ করি। আমাদের এলাকায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরা এই কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন বেশি।

অসহায়-দরিদ্র দিনমজুর পরিবারে জন্ম সুমন হোসেনের। দিনমজুর বাবার আয়ে কোনোরকম চলে তাদের পরিবার। পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী সুমনের বাবা ঠিকমতো খাতা-কলম কিনে দিতে পারেন না। এ জন্য সুমন এখানে কাজ করতে শুরু করে। অষ্টম শ্রেণিপড়ুয়া সুমন হোসেন বলে, আমিও এখানে কাজ করি। ব্যাগ বানিয়ে যা পাই, তা দিয়ে লেখাপড়ার খরচ মিটিয়ে পরিবারকে সাহায্য করতে পারছি। আগে বাড়ি থেকে টাকা নিতে হতো। এখন আর নিতে হয় না। এখন বেশ ভালো আছি। কারও কাছে হাত পাততে হয় না।

তেবাড়িয়া এলাকায় ফুল ব্যাগ তৈরির উদ্যোক্তা মিঠুন কুমার বলেন, দুই বন্ধু মিলে ২০১৮ সালের শেষের দিকে ব্যাগ তৈরির কাজ শুরু করি। আগে জেলার বাইরে অপরের কারখানায় কাজ করতাম। এখন নিজেই উদ্যোক্তা হয়েছি। আমি। আমার বন্ধুসহ বর্তমানে ১৭ জন কাজ করছি। প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার ব্যাগ তৈরি হয়। যার আনুমানিক বাজার মূল্য আট লাখ টাকা।

তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক কারিগর প্রতিমাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করে। অনেকে ২০ হাজার টাকাও পান। ইচ্ছে আছে নিজের একটি কারখানা করার। ব্যবসাটা আরও বড় করার। কিন্তু অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে তা সম্ভব হয়নি।

পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তুহিন শেখ বলেন, কুমারখালী একটি শিল্প এলাকা। তেবাড়িয়ায় ফুল ব্যাগ তৈরি করে বেকার ও অসহায় মানুষগুলো স্বাবলম্বী হচ্ছে। সুযোগ পেলে সবাই অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিতান কুমার মন্ডল বলেন, আমাদের জনসংখ্যার বেশির ভাগই যুব সমাজ। আমি আনন্দিত যে কুমারখালীতে বেশ কিছু উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। তেবাড়িয়া গ্ৰামের মিঠুন ও নিমাই দুই বন্ধু ফুল ব্যাগ ও কুসুম কভার তৈরি করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। সেই সঙ্গে তারা এলাকার নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলছে। এ ধরনের উদ্যোক্তাদের সাধুবাদ জানাই।

তিনি আরও বলেন, সোমবার তাদের কারখানা পরিদর্শন করেছি। তাদের কাজকে সহজ ও প্রসারিত করতে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। তাদের তৈরি পণ্য বাজারে আরও সম্প্রসারিত করতে উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করবে।

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
 কুষ্টিয়ার  বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর