বুধবার   ১৩ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ২৮ ১৪২৬   ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

সর্বশেষ:
সারাদেশে নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা ১৩ জেলা প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ : মোংলা-পায়রা বন্দরে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত সাকিব আল হাসান ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র কারণে আজ জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা স্থগিত শ্রমিকলীগের সম্মেলন উদ্বোধন করলেন শেখ হাসিনা
১৭

চুয়াডাঙ্গার বাজারে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল সার!

নিজস্ব প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৬ নভেম্বর ২০১৯  

চুয়াডাঙ্গায় বাজারে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল সার। এসব ভেজাল দস্তা সার কিনে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন চুয়াডাঙ্গার নিরীহ কৃষকরা। এ সুযোগে ভেজাল সার বিক্রি করে কোটিপতি বনে গেছেন সার ব্যবসায়ীরা। 

অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সামনেই এসব ভেজাল দস্তা সার বিক্রি হলেও উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে কৃষকরা শুধু প্রতারিতই হচ্ছেন না, এসব ভেজাল সার জমিতে প্রয়োগ করায় জমির উর্বরা শক্তি দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে। আর এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে দেশের কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, কৃষকরা মূলত জমির উর্বরা শক্তি বাড়ানোর মাধ্যমে অধিক ফসল উৎপাদনের জন্যই বিভিন্ন ধরনের জিংক সালফেট সলুবর বোরন সার ব্যবহার করে থাকেন। এসব সারের প্রধান দুটি উপাদান দস্তা ও সালফার। যা অবশ্যই প্রয়োজনীয় মাত্রায় থাকতে হবে। পাশাপাশি মাত্রা অনুযায়ী লেড, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও নিকেলও থাকতে হয়। কিন্তু বাজারে বিদ্যমান বিভিন্ন কোম্পানির দস্তা সারে প্রয়োজনীয় মাত্রায় দস্তা ও সালফার নেই। উল্টো বেশীমাত্রায় ক্ষতিকারক উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে বলে জানা গেছে। নিম্নমানের ও ভেজাল সারের কারণে দেশের কৃষকরা প্রতারিত ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি উর্বরা শক্তি হারাচ্ছে কৃষিজমির। 

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সার উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে সরকারের শক্ত নীতিমালা রয়েছে। মান যাচাই করতে নিয়মিত পরিদর্শন করার নির্দেশনাও রয়েছে।

এদিকে, চুয়াডাঙ্গা জেলায় সারের চাহিদা থাকায় এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মুনাফা লুটতে ভেজাল ও নিম্নমানের দস্তা সার বিক্রি করছেন। যা পাওয়া যাচ্ছে জেলার বিভিন্ন সার, ডিজেল, কীটনাশক ও মুদির দোকানে। শহরের চাইতে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দোকানগুলোতেও পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে কৃষি বিভাগের খুব একটা নজরদারি থাকে না। কৃষি উপকরণের মালামাল হাতের কাছে পাওয়ায় চাষিদের উপকার হলেও পাশাপাশি প্রতারিতও হচ্ছেন তারা।

আরো জানা গেছে, কৃষকের হাতে সব সময় টাকা থাকে না। তাই স্থানীয় বাজার বা মহল্লার দোকান থেকে সার, ডিজেল, কীটনাশক বাকিতে ক্রয় করেন। আর এ সুযোগে দোকানিরা এসমস্ত ভেজাল সার কৃষকের হাতে তুলে দেন। সার প্রাকৃতিক অথবা কৃত্রিম উৎসের জৈব ও অজৈব বস্তু যা গাছের বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য এক বা একাধিক পুষ্টি উপাদান মৃত্তিকাতে সরবরাহ করে।

যে কোনো অজৈব লবণ, অ্যামোনিয়াম সালফেট বা জৈব বস্তু যা গাছের পুষ্টি উপাদান সরবরাহের মাধ্যমে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে ব্যবহৃত হয়। আর এসব বস্তুকে বাণিজ্যিক সার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কৃষিকাজে ব্যবহৃত সামগ্রীর মধ্যে সারই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। 

চাষি মোবারক হোসেন জানান, ভেজাল দস্তা সারে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। তা না হলে ৪০ টাকা কেজি দরের দস্তার প্যাকেটে লেখা আছে ৩৬ শতাংশ আবার ২০০ টাকার প্যাকেটেও লেখা আছে ৩৬ শতাংশ। সহজেই বুঝে নেন বাজারে কীভাবে দস্তা সার বিক্রি হচ্ছে।

চাষি আকরাম, সবেদ, রবি, কবীর, জাভিদ, পুনব সরকার, নুরু ও শুকুর আলী জানান, চাষিরা দোকানদার নির্ভরশীল। চাষাবাদ চলে দাদনের মতামতের ওপর। বাকিতে ক্রয় করে চাষাবাদ করে তারপর দোকানিকে টাকা দিতে হয়। কোনটা আসল কোনটা নকল প্যাকেটের মধ্যে কি আছে বুঝা বা জানার সুযোগ নেই। সারের প্রয়োজন হলে দোকানিকে বললে দোকানদার দিয়ে দেয়। ফসল বিক্রির পর টাকা শোধ করি।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সার ব্যবস্থাপনা সংশোধন আইন ২০১৮-এর খসড়ায় নিবন্ধন ছাড়া বা ভেজাল সার বিক্রি, বিপণন ও বিতরণের অপরাধ করলে দুই বছরের জন্য কারাভোগ করতে হবে বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা গুণতে হবে। ২০০৬ সালের আইনের ৮ (১) ধারা লঙ্ঘনে বা ভেজাল সার বিক্রিতে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৩০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান ছিল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে আরো জানা গেছে, জেলায় মোট কৃষি কর্মকর্তা আছেন ২১ জনের জায়গায় ৮ জন। মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি অফিসার আছেন ১১২ জন। বাজার থেকে ২৫ প্রকার দস্তা সারের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকা ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। তার প্রতিবেদনও চুয়াডাঙ্গা কৃষি অধিদপ্তরের হাতে পৌঁছেছে। তবে কোন কোন কোম্পানির সারের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে তার তথ্য জানাতে গড়িমসি শুরু করে দিয়েছে কৃষি অধিদপ্তর।

অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সুফি মো. রফিকুজ্জামান জানান, এর তথ্য জেলা অফিসে আছে সেখান থেকে নেন। জেলা অফিস থেকে জানানো হয়েছে, সদর উপজেলা অফিসে আছে সেখান থেকে নেন। সদর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কৃষি অফিসার আলমগীর হোসেন জানান, অফিসে গিয়ে তথ্য দিচ্ছি। তারপর থেকে এক সপ্তাহ ধরে মোবাইল ফোন রিসিভ করা বন্ধ করে দিয়েছেন। দায়িত্বরত অফিসাররা মাঠপর্যায়ে একটু তৎপর হলেই অবাধে এসব কোম্পানিগুলো ভেজাল দস্তা সার বিক্রি করতে পারতো না বলে চাষিরা মনে করছেন।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আলী হাসান জানান, কত প্রকার দস্তা সার বাজারে আছে তার কোনো হিসাব নেই। বাজারে ভেজাল দস্তা সার আছে এটা অস্বীকার করার কিছুই নেই। তবে ২৫ প্রকার দস্তা সারের নমুনা ঢাকায় পাঠিয়ে পরীক্ষা করে আনা হয়েছে। তার তথ্য উপজেলা কৃষি অফিসগুলোতে আছে। সেখান থেকে তথ্য নেন।

তিনি আরও বলেন, কিছু আইনি জটিলতা আছে। বাজার থেকে একটি সারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তারপর তা ল্যাবে পাঠাতে ১৫শ টাকা খরচ হয়। তার তথ্য হাতে এলে তারপর সেই সারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। এখানেও সময়ের ব্যাপার। তারপরও যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে ভেজাল সার শনাক্ত করে দোকানদার এবং কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার।

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
 কুষ্টিয়ার  বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর