সোমবার   ২০ জানুয়ারি ২০২০   মাঘ ৬ ১৪২৬   ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

সর্বশেষ:
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু ৩ ফেব্রুয়ারি ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব শেষ হচ্ছে আজ ঢাকা সিটি ভোট ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটির ভোটকেন্দ্রের তালিকা প্রকাশ
২২১

ইসলামের দৃষ্টিতে গান ও বাদ্যযন্ত্র

প্রকাশিত: ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮  

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তায়ালার। যিনি মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে অলংকৃত করেছেন বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান ও হেকমত দ্বারা এবং সেই মানব জাতির সঠিক দিক নির্দেশনার জন্য প্রেরণ করেছেন মহাগ্রন্থ আল-কোরআন।

ইসলামের দৃষ্টিতে গান ও বাদ্যযন্ত্র (পর্ব-১) এ ইসলামে গান ও বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কিত কোরআনের বানী, হাদিস, তাবেয়ীদের বক্তব্য ইত্যাদি তুলে ধরা হয়েছে।

আজকের আলোচনায় "দফ" নামক বাদ্যের পরিচয়, এর প্রচলন এবং ইসলামের এই সকল বিধান না মানার পরিণাম সম্পর্কে আলোকপাত করা হবে।

আমাদের সমাজের মানুষের বদ্ধমূল ধারণা হলো যে, গান গাওয়াই হারাম, আর যদি তা হয় বাদ্য দিয়ে তাহলে তো কথাই নেই।

কিন্তু আসলে এ ব্যাপারে ইসলামের কি বিধান রয়েছে তা আমাদের জানা দরকার।

ইসলামের একটি সাধারণ মূলনীতি হলো যে, পবিত্র কোরআন ও হাদিসে যে সব বিষয়কে হারাম বলা হয়েছে তা ব্যতীত অন্য সব কিছু হালাল। তাই কোনো কিছুকে হারাম তথা নিষিদ্ধ বলার জন্য পবিত্র কোরআনের আয়াত কিংবা নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত সহীহ হাদিস এর প্রয়োজন অন্যথায় তা মুবাহ বা জায়েজ হিসেবেই পরিগণিত হবে।

গান এবং বাদ্য-যন্ত্রের ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে ৪ ধরনের মতামত পাওয়া যায়-

১. কোনো ধরনের গানই জায়েজ না। গান গাওয়াই হারাম।

২. কেবল খালি গলায় গাওয়া ইসলামী গান জায়েজ।

৩. কেবল দফ ব্যবহার করা জায়েজ।

৪. শর্ত সাপেক্ষে বাদ্য-যন্ত্র ব্যবহার করে কেবল ইসলামী গান গাওয়া জায়েজ।

 

ইসলামের শুরুর দিকে আরব দেশে দফ নামক একটি যন্ত্র ব্যবহার হতো। দফ প্রাণীর চামড়া দিয়ে তৈরি, যাতে আঘাত করলে জোরে শব্দ হয়। দফে বিভিন্ন প্রকার শব্দ সৃষ্টি করে বিভিন্ন প্রকার সঙ্কেত দেয়া হতো। ধরা যাক, ক্রমাগত আঘাত করে শব্দ সৃষ্টি করে যদি শত্রু আক্রমণের ঘোষণা দেয়া হয় তবে একটি বড় একটি ছোট আঘাত করে হয়তো কোথাও সমবেত হওয়ার ঘোষণা দেয়া হলো- এ রকম। যারা সরাসরি আরবে দফ দেখেছেন, তাদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, দফ-এর এক পাশ খোলা। বাজালে ঢ্যাব ঢ্যাব আওয়াজ হয়। প্লাস্টিকের গামলা বাজালে যেমন আওয়াজ হবে তেমন। আসলে দফ কোনো বাদ্যযন্ত্রের পর্যায়ে পড়ে না।

আওনুল বারী গ্রন্থে দফ-এর পরিচয় দিতে গিয়ে লেখা হয়েছে যে, এর আওয়াজ স্পষ্ট ও চিকন নয় এবং সুরেলা ও আনন্দদায়কও নয়। কোনো দফ-এর আওয়াজ যদি চিকন ও আকর্ষণীয় হয় তখন তা আর দফ থাকবে না; বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হবে। (আওনুল বারী ২/৩৫৭)

আর দফ-এর মধ্যে যখন বাদ্যযন্ত্রের বৈশিষ্ট্য এসে যাবে তখন তা সর্বসম্মতিক্রমে নাজায়েয বলে পরিগণিত হবে। (মিরকাত ৬/২১০)

দফ সম্পর্কিত ইসলামে বিভিন্ন হাদিস প্রচলিত রয়েছে। যেমন : আয়েশা (রা.) হতে একটি হাদিস বর্ণিত আছে যে, ‘একদা রাসূল (সা.) তার ঘরে প্রবেশ করেন। তখন তার ঘরে দুই বালিকা দফ বাজাচ্ছিল। অন্য রেওয়ায়েতে আছে গান করছিল। হজরত আবু বকর (রা.) তাদের ধমক দেন। তখন রাসূল (সা.) বললেন; তাদের গাইতে দাও। কারণ প্রত্যেক জাতিরই ঈদের দিন আছে। আর আমাদের ঈদ হলো আজকের দিন।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৯৪৪, সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৮৯২)

আবার দফ বাজিয়ে বিয়ে প্রচারের জন্য গান গাওয়া আর তাতে মানুষদের উদ্ধুদ্ধ করা সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘হারাম ও হালালের মধ্যে পার্থক্য হলো দফের বাজনা। এই শব্দে বুঝা যায় যে, সেখানে বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।’ (তিরমিজী: ১০০৮; ইবনে মাজাহ: ১৮৮৬; শাইখ আলবানি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন)

সহীহ বোখারী শরীফ ও অন্যান্য সীরাহ-গ্রন্থে উদ্ধৃত এসব হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি যে মহানবী (সা.) যখন মক্কা মোয়াযযমা হতে মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরত করেন, তখন ওই নগরীর মানুষ তাকে মহা উৎসাহে স্বাগত জানান। মদীনায় এক আনন্দ-উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যার নজির ইতিপূর্বে কখনোই দেখা যায়নি। তাকে অভ্যর্থনা জানানোর উদ্দেশ্যে সর্বসাধারণ রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে জড়ো হন; নারী-পুরুষ ও শিশু সবাই উৎফুল্লচিত্তে তাকে সম্ভাষণ জানান। এই সময় অবিরাম "দফ" বাজিয়ে গান করা হয়-

‘হেদায়াতের পূর্ণচন্দ্র আমাদের ভাগ্যাকাশে ‘আল-ওয়াদা’ এলাকায় হয়েছেন উদিত যতোদিন আল্লাহর কোনো এবাদতকারী থাকবেন আমরা শোকর করতে হবো বাধিত হে রাসূল, আপনি আমাদের মাঝেই হয়েছেন (খোদা কর্তৃক) লালিত, পালিত এসেছেন নিয়ে এক কর্তব্য যা হতে হবে মান্যকৃত আপনি এনেছেন এ নগরীর জন্যে মাহাত্ম্য তাই স্বাগতম, সেরা (ওই) আহ্বান আল্লাহর রাস্তার দিকে, এ কথা সত্য।’

ইসলাম কোনো জিনিসের মধ্যে ক্ষতিকারক কোনো কিছু না থাকলে তাকে হারাম করেনি। গান ও বাজনার মধ্যে নানা ধরনের ক্ষতিকর জিনিস রয়েছে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (র.) এ সম্বন্ধে বলেন: বাজনা হচ্ছে নফসের মদ স্বরুপ। মদ যেমন মানুষের ক্ষতি করে, বাদ্যও মানুষের সেই রকম ক্ষতি করে। যখন গান বাজনা তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখনই তারা শিরকে পতিত হই। আর তখন তারা ফাহেশা কাজ ও জুলুম করতে উদ্যত হয়। তারা শিরক করতে থাকে এবং যাদের কতল করা নিষেধ তাদেরকেও কতল করতে থাকে। যেনা করতে থাকে। যারা গান বাজনা করে তাদের বেশির ভাগের মধ্যেই এই তিনটি দোষ দেখা যায়। তাদের বেশির ভাগই মুখ দিয়ে শিস দেয় ও হাততালি দেয়। (মাজমু’ আল-ফাতওয়া ১০/৪১৭)

১.শিরকের নিদর্শন: তাদের বেশির ভাগই তাদের পীর অথবা গায়কদের আল্লাহর মতই ভালোবাসে অথবা আরো অধিক। যা শিরক করার সমান।

২.ফাহেশার মধ্যে আছে: গান হরো যেনার রাস্তায় গমনের স্বরূপ। এর কারণেই বেশির ভাগ ফাহেশা কাজ অনুষ্ঠিত হয় গানের মজলিসে। যেখানে পুরুষ, বালক, বালিকা ও মহিলা চরম স্বধীন ও লজ্জাহীন হয়ে পড়ে। এভাবে গান শ্রবন করতে করতে নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনে। তখন তাদের জন্য ফাহেশা কাজ করা সহজ হয়ে দাড়ায়, যা মদ্যপানের সমতুল্য কিংবা আরও অধিক।

৩.কতল বা হত্যা: অনেক সময় গান শ্রবণ করতে করতে উত্তেজিত হয়ে একে অপরকে কতল করে ফেলে।

৪.পীর-সূফিদের বিদআতী গানের আসরে শরীয়ত বিরোধী অদ্ভুত কর্মকান্ড: এই অবস্থায় শয়তানও তাদের নিয়ে খেলা করে। তারা আগুনে প্রবেশ করে, কেউ গরম লোহা শরীরের মধ্যে কিংবা জিহ্বায় প্রবেশ করায় অথবা এসব কাজ যে সব শয়তানরা সেখানে উপস্থিত হয় তারা তাদের সাহায্য করে। কারণ, ঐ লোকেরা আল্লাহর স্বরণ হতে দূরে রয়েছে।

এগুলো ছাড়াও সাহাবী ও তাবেয়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী বহু গুনাহর সমষ্টি হল গান ও বাদ্যযন্ত্র। যথা :

১.নিফাক এর উৎস

২.ব্যভিচারের প্রেরণা জাগ্রতকারী

৩.মস্তিষ্কের উপর আবরণ

৪.কোরআনের প্রতি অনিহা সৃষ্টিকারী

৫.আখিরাতের চিন্তা নির্মূলকারী

৬.গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিকারী ও

৭.জিহাদী চেতনা বিনষ্টকারী।– (ইগাছাতুল লাহফান ১/১৮৭)

 

ইসলামের বিধি-বিধান না মেনে এই সকল পাপাচারে লিপ্ত হলে কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে। কোরআনের মহান আল্লাহ্ পাক বলেছেন যে, ‘রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।’ (সূরা: আল-হাশর, আয়াত: ০৭)

মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআন মাজীদে বলেছেন যে, ‘এক শ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে পথভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং উহাকে (আল্লাহর পথ) নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে । এদের জন্যে রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।’ (সূরা: লোকমান, আয়াত: ০৬০)

আল্লাহ ও রাসূলের কথা শোনার পরও যদি আমরা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেই, তা মানার ক্ষেত্রে টালবাহানা করি, তবে তার চেয়ে মন্দ আর কি হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা ‌বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য কর এবং তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না, অথচ তোমরা শুনছ। আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বলে আমরা শুনেছি অথচ তারা শুনে না।’ (সূরা: আল-আনফাল, আয়াত: ২০-২১)

রাসূল (সা.) বলেন, ‘গায়ক ও গান শ্রবণকারীর ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ (তিরমিযি শরিফ)

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘গান মানব অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে; যেমন পানি রবিশষ্য উৎপাদন করে।’ (রুহুল মাআনী ৭/৬৮)

হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সঃ) ইরশাদ করেন, ‘বাদ্যযন্ত্র ধ্বংস করার জন্য আমি প্রেরিত হয়েছি।’ (আবু দাউদ শরিফ-৬৭৪)

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই উম্মত ভূমিধস, উৎক্ষেপণ ও বিকৃতি সাধন হবে, যখন তারা মদ পান করবে, গায়িকা দ্বারা গানের আয়োজন করবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে।’ (মুসাদে আহমদ, রুহল মাআনী ৭/৭৬)

যারা গান-বাদ্য করে অথবা যাদের ঘরে এগুলোর ব্যবহার হয় তাদের উভয়ের উপরই অভিশাপ (বায়হাকী)

শয়তান অভিশপ্ত হয়ে যখন আসমান থেকে নামে তখন যে আরজ করে, হে আল্লাহ তুমি তো আমাকে অভিশপ্ত করলে এখন তুমিই বলে দাও, আমার এলেম কী হবে? আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমার এলেম হলো- যাদু, এরপর শয়তান আরজ করল আমার পছন্দনীয় আওয়াজ কী হবে? আল্লাহ তায়লা বলেন, গান-বাজনা। যে ব্যক্তি গান শুনার উদ্দেশ্যে গায়িকাদের মজলিসে বসে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার কানে শিশা ঢেলে দিবেন। (তিরমিজি)

পরিশেষে বলা যায়, আমাদের উচিত ইসলামের সকল বিধি-বিধান পরিপূর্ণ ভাবে মেনে চলা এতে জীবন সুন্দর ও সুশোভিত হবে। বেশি আধুনিক হতে গিয়ে নিজের মূলকে হারিয়ে ফেলা উচিত নয়। কারণ অশ্লীলতা কখনো আধুনিকতা হতে পারেনা আর তাই হয়ত এক বিদ্যান ব্যক্তি একটি শিক্ষণীয় উক্তি করেছিলেন যে, তোমরা আধুনিক হও ভালো কথা, কিন্তু আধুনিক হতে গিয়ে মনুষ্যত্বের সীমানা অতিক্রম করো না এবং শয়তানের দোসর বনে যেও না।

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
 কুষ্টিয়ার  বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর