সোমবার   ২০ জানুয়ারি ২০২০   মাঘ ৬ ১৪২৬   ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

সর্বশেষ:
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু ৩ ফেব্রুয়ারি ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব শেষ হচ্ছে আজ ঢাকা সিটি ভোট ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটির ভোটকেন্দ্রের তালিকা প্রকাশ
১৭

ইতির কৃতিত্বে চুয়াডাঙ্গায় আনন্দের জোয়ার

নিজস্ব প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০ ডিসেম্বর ২০১৯  

এসএ গেমসের আর্চারিতে ইতি খাতুনের স্বর্ণ জয়, আনন্দে ভাসাচ্ছে গোটা চুয়াডাঙ্গাকে। এক সময়ের নিন্দুক এলাকাবাসীও, এখন গর্ব করেন তাকে নিয়ে। কামনা করেন ভবিষ্যৎ সাফল্য। দেশের পতাকা সমুন্নত রাখা ইতিকে নিয়ে এখন গর্ব করেন তার পিতা-মাতা। 

তৃণমূল থেকে তুলে আনা আর্চারি ফেডারেশনের সদস্য সোহেল আকরাম অবশ্য সাফল্যের কৃতিত্ব দিলেন সংশ্লিষ্ট সবাইকে। 

বাবার অভাবের সংসার। দারিদ্র্যের কারণে মাত্র ১২ বছর বয়সেই তাকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল পরিবার। ইতি তা মেনে নিলে হয়তো তার সম্ভাবনার আলো সেখানেই নিভে যেত। কিন্তু বাল্যবিয়েকে না বলে নিজের জীবনকে বদলে দিতে পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করে খেলাধুলা। সেটাই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে ইতির।

এলাকার লোকজন জানান, ইতি তখন ক্লাস সিক্সে পড়াশোনা করত। বিয়ের দিনক্ষণ ধার্য হলে ইতি বাড়ি থেকে পালিয়ে খালু ডালিম মোল্লার বাড়িতে গিয়ে ওঠে। ইতির প্রতিভার কথা চিন্তা করে খালু ডালিম মোল্লা ইতিকে নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রাখেন। ফলে বাল্যবিয়ে থেকে রক্ষা পায় ইতি। ইতির খালু ডালিম মোল্লা যুগান্তরকে বলেন, ইতির প্রতিভা দেখে আগেই বুঝেছিলাম সে একদিন আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। এখন শুধু আমাদের নয় গোটা বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নঈম হাসান জোয়ার্দ্দারই ইতিকে গড়ে তুলেছেন। ধন্যবাদ জানাই তাকে।’

ইতির বাবা ইবাদত আলী চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার হিজলগাড়ি বাজারের একটি খাবারের হোটেলে কারিগর হিসেবে দিন হাজিরায় কাজ করেন। কয়েকদিন ধরে বেশ অসুস্থ। বাস করেন রেলের খাসজমিতে।

ইতি পিইসি পরীক্ষা দেয় ২০১৫ সালে। পরে নিজের ইচ্ছায় ২০১৬ সালে ভর্তি হয় চুয়াডাঙ্গা ঝিনুক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। সম্প্রতি জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছে সে। বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন ইভেন্টে পুরস্কার পেয়ে আগেই সে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ আরচার ফেডারেশন দেশব্যাপী খেলোয়াড় অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে। চুয়াডাঙ্গায় আর্চারি বাছাই কার্যক্রমে ৪০ জন ছেলে-মেয়ে অংশগ্রহণ করেন। সেখান থেকে প্রাথমিকভাবে ১০ জনকে নির্বাচন করা হয়। এরপর ১০ জনের মধ্যে থেকে পাঁচজনকে ঢাকায় উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য ডাকা হয়। এদের মধ্যে ইতি খাতুনও ছিল। এবার ইতিকে যেতে হবে ঢাকায়। কিন্তু বাবা-মা ও দুলাভাই বাধ সাধে। তারা বলেন মেয়েরা খেলাধুলা করে কী লাভ। পরে বিয়ে হবে না। 

এ সময় জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নঈম হাসান জোয়ার্দ্দার ও বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য সোহেল আকরাম ইতির বাবাকে চুয়াডাঙ্গা স্টেডিয়ামে ডাকেন। দু’জন মিলে ইতির বাবাকে বোঝান। পরবর্তীতে ইতি চুয়াডাঙ্গায় ফিরে এসে দেখা করেন সোহেল আকরামের সাথে। তার বাবার কাছ থেকে সোহেল আকরাম ইতির দায়িত্ব নেন নিজের মেয়ে হিসেবে। তিনি ইতিকে আবার ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সেই যে ইতি ঢাকায় গেল আর তাকে পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। পড়াশোনার পাশাপাশি আর্চারি প্রশিক্ষণ নিয়েছে নিয়মিত। সোহেল আকরাম ইতির লেখাপড়ার খরচ ও আর্চারি খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলতে সব ধরনের সহযোগিতা করেছেন।

ইতি খাতুন এর আগে আর্চারি খেলতে স্পেন, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড সফর করেছে। দেশে জাতীয় পর্যায় ও আরচারি ফেডারেশনের আয়োজনে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে। নেপালে এসএ গেমসে অংশ নিয়ে রোববার দলীয় ইভেন্টে দুটি স্বর্ণপদক পায়। সোমবার একক ইভেন্টে জিতেছে তৃতীয় স্বর্ণপদক।

চুয়াডাঙ্গা ঝিনুক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেবেকা খাতুন জানান, ‘ইতি প্রতিভাবান মেয়ে। সোহেল আকরাম আর্চারি খেলার জন্য স্কুল থেকে ওকে নিয়ে যান। তাকে লেখাপড়ার বিষয়ে শিক্ষকরা সব ধরনের সহযোগিতা করতেন। সে স্বর্ণ পাওয়ায় আমরা খুশি।’ 

সোহেল আকরাম জানান, ‘ইতি যে দিন ঢাকায় যায় সেদিন থেকে ওকে আমি নিজের মেয়ের মতো করে দেখি। কোনো অভাব-অনটন বুঝতে দিইনি। ইতিকে বলেছিলাম তুই দেশের জন্য হলেও একটি স্বর্ণপদক ছিনিয়ে আনবি। আমার ইচ্ছা ইতি একদিন দেশের হয়ে অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণ করবে।’

ইতির বাবা ইবাদত আলী জানান, ‘মেয়েকে অনেক কষ্টে মানুষ করেছি। দারিদ্র্যের কারণে ইতিকে ছোটবেলায় বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছিলাম। কারণ তাকে পড়াশোনা করানোর মতো ক্ষমতা ছিল না আমার। ওর শখ পূরণ করার মতো ক্ষমতা আমার ছিল না, এখনও নেই। নঈম মামা ও সোহেল মামা আমার মেয়ের দায়িত্ব নিয়েছে। এখন সে দেশের জন্য সম্মান বয়ে নিয়ে এসেছে। এখন সে যত খুশি খেলাধুলা করুক। আর বিয়ের কথা বলব না।’

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
 কুষ্টিয়ার  বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর