শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২০   কার্তিক ৭ ১৪২৭   ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
১০

`আকবর দ্য ব্যাড`

নিউজ ডেস্ক:

প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর ২০২০  

ভারতবর্ষের সম্রাট জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবরকে বলা হয় 'আকবর দ্য গ্রেট'। মাত্র ১৪ বছর বয়সে শাসনভার কাঁধে নিয়ে সম্রাট আকবর কয়েকশ বছর পর আজও স্মরণীয়। তবে সিলেট পুলিশের এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া কিন্তু ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তিনি তার বুদ্ধি দিয়ে অন্যায় আর অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। অপকর্মের জন্য লোকজনের কাছে তিনি এখন 'আকবর দ্য ব্যাড' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

গত ১১ অক্টোবর সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে যুবক রায়হান আহমদকে নির্যাতন করে মেরে ফেলার পর ওই ফাঁড়ির ইনচার্জ (বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত) আকবরের কুকীর্তি বেরিয়ে আসছে। আকবরের অপরাধের তদন্ত করতে বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার (চাহিদাপত্র) দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের এমপি ড. এ কে আব্দুল মোমেন। আকবর যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন, সে জন্য দেশের সব ইমিগ্রেশনে চিঠি দিয়েছে পিবিআই।

ছাত্রদলের রাজনীতি করলেও ২০১৪ সালে এসআই পদে নিয়োগ পাওয়া আকবর সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কয়েকটি নাটকে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করে আলাদা পরিচিতি লাভ করেছিলেন। সর্বশেষ 'গেমওভার' (খেলা শেষ) নামে একটি নাটকে তাকে অভিনয় করতে দেখা গেছে। কিন্তু রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় নায়ক থেকে ভিলেনে পরিণত হয়েছেন তিনি। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি কোটি কোটি টাকার মালিকও হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আকবর ভূঁইয়া বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি চালাতেন নিজস্ব স্টাইলে। ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে মারধর ও টাকা আদায় করতেন তিনি। তার নির্যাতনের শিকার অনেকেই এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তাদেরই একজন লিসাত লিজা। তিনি অভিযোগ করেন, ১০ হাজার টাকা চাঁদা না পেয়ে তিনি, তার স্বামী ও স্বামীর ভাগ্নেকে মামলায় ফাঁসিয়ে দেন আকবর। খাদিমপাড়া এলাকার বাসিন্দা লিজা বলেন, সম্প্রতি এক ঘটনায় ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে আকবর তাদের রক্ষা না করে হামলাকারীদের পক্ষ নেন।

আরও অনেকেই আকবরের হয়রানির শিকার হয়েছেন। নগরীর ব্যস্ততম এলাকার মধ্যে বন্দরবাজার ফাঁড়ি হওয়ায় প্রতিদিন ওই এলাকার স্থায়ী ও ভাসমান হকার, আবাসিক হোটেল, মাদক কেনাবেচা, অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত ও ছিনতাইকারী গ্রুপের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন আকবর। এমনকি নিরীহ পথচারীদের আটকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত চাঁদাবাজি করতেন বন্দরবাজার ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা। গ্রিনবাংলা নামে যে ইউটিউব চ্যানেলে তিনি কাজ করতেন, সেই চ্যানেলের এক শিল্পীর কাছে আকবর ৫ লাখ টাকাও দাবি করেছিলেন বলে জানা যায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের বেড়তলা বগৈর গ্রামের স্কুল শিক্ষক জাফর আলী ভূঁইয়ার ছেলে আকবর ২০০৩ সালে আশুগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ২০০৫ সালে উপজেলার ফিরোজ মিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ২০০৭ সালে পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরি নেন তিনি। ২০১৪ সালে এসআই পদে নিয়োগ পাওয়ার পরই তার আমূল পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় তার বাবা জেলও খাটেন। এক সময় চাকরিচ্যুতও হন তিনি।

গত ৬ বছরে আকবর অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এলাকায় অনেক জায়গা কিনেছেন তিনি। বানিয়েছেন দৃষ্টিনন্দন বিশাল বাড়িও। তবে আকবরের ছোট ভাই আরিফ ভূঁইয়া দাবি করেন, তার ভাই কোনো অপরাধ করতে পারেন না। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন। আশুগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হানিফ মুন্সি বলেন, আকবরের ঘটনাটি পুরো আশুগঞ্জের জন্য লজ্জার।

গত রোববার রায়হান মারা যাওয়ার পর তিন দিন ধরে তার খোঁজ মিলছে না। জনশ্রুতি রয়েছে, আকবর সিলেট সীমান্ত দিয়ে মেঘালয়ে পালিয়ে গেছেন।

রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, তিনি টাকার জন্য একজন মানুষকে মেরে ফেলেছেন। সন্তানকে পিতাহারা করেছেন। তার শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সিলেটবাসী রায়হান পরিবারের সঙ্গেই থাকবে।

পুলিশ হেফাজতে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এসআই আকবরকে প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন পিবিআইপ্রধান বনজ কুমার মজুমদার। বৃহস্পতিবার পিবিআইর ধানমন্ডির সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এসআই আকবর যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন সে জন্য সব ইমিগ্রেশনে চিঠি দেয়া হয়েছে। তাকে ধরার জন্য টিম গঠন করা হয়েছে। 

 কুষ্টিয়ার  বার্তা
 কুষ্টিয়ার  বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর